Featured

ক্ষতিকর ইউক্যালিপ্টাস গাছের বিস্তার ঘটেই চলছে উত্তরাঞ্চলের

http://tistanews24.com/wp-content/uploads/2015/10/582.jpgতিস্তা নিউজ ডেস্ক: ইউক্যালিপ্টাস বা আকাশমনি আমাদের সবার অতিপরিচিত একটি বৃক্ষের নাম। সামাজিক বনায়নের বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ ইউক্যালিপ্টাস গাছ লাগানো হয়েছে। কিন্তু এই গাছ আমাদের জলবায়ু, মাটি, কৃষি জমি ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। বর্তমানে দেশের উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় এই গাছের ব্যাপক প্রসার ঘটছে। উত্তরাঞ্চলের কৃষকরা অনেকটা না জেনেই ইউক্যালিপ্টাস গাছ, কৃষি জামির পাশে, বাড়ির আঙ্গিনায় রাস্তার পাশে ব্যাপকভাবে রোপন করছে। দেখা যায় গ্রামের কৃষকরা হাটে মালামাল বিক্রি শেষে বাড়ি ফেরার পথে হাতে করে কয়েকটি ইউক্যালিপ্টাস নিয়ে যায়। এরপর এগুলো বাড়ির অঙ্গিনাসহ পতিতজমিসহ কৃষি ক্ষেত্রের পাশে রোপন করে।

মূলত দ্রুত বর্ধনশীল হওয়ার কারণে ইউক্যালিপ্টাস গাছের প্রতি এই অঞ্চলের মানুষের ঝোঁক একটু বেশি। দেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া থানাসহ অন্যান্য থানা স্থানীয়রা বসত বাড়ির পাশে, পুকুর পাড়ে, রাস্তার ধারে, পতিত জমি ও আবাদি জমির আইলে ইউক্যালিপ্টাস গাছ রোপন করেছে। রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, নিলফামারীসহ উত্তরের বেশিরভাগ জেলায় দীর্ঘদিন থেকে ইউক্যালিপ্টাস রোপন করা হচ্ছে। যার ফলশ্রুতিতে উত্তরের আকাশে এখন ইউক্যালিপ্টাসের আধিপাত্য।

তবে উত্তরের মানুষ অনেকটা না জেনেই ক্ষতিকারক এই বৃক্ষ রোপন করছে। তাদের ধারণা এই গাছ অল্প সময়ে দ্রুত বড় হয়। ইউক্যালিপ্টাস দেখতে স্মার্ট বা সুন্দর বৃক্ষ। রোপনের কয়েক বছরের মধ্যে ইউক্যালিপ্টাস প্রতিটি কয়েক হাজার টাকায় বিক্রি করা যায়। মূলত এ কারণে উত্তরাঞ্চলের মানুষ এই বৃক্ষ রোপনের প্রতি ঝুঁকে পড়েছে।

ইউক্যালিপ্টাস পরিচিতি : ইউক্যালিপ্টাস বা আকাশমণির ইংরেজি নাম Auri, Ear leaf, Acacia ও বৈজ্ঞানিক নাম Acacia auriculiformis. এটি খুব দ্রুত বাড়ে। ইউক্যালিপ্টাস অন্যান্য গাছে তুলনা বেশি খাবার খায় ও অক্সিজেন শোষণ করে এবং কার্বন-ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করে। পরিবেশ বান্ধব না হওয়ায় কোনো পাখি এই গাছে বাসা বাধে না। ইউক্যালিপ্টাস গাছ বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত কমিয়ে ফেলে।

অভিযোগ রয়েছে কিছু সংখ্যক নার্সারি চাষী ইউক্যালিপ্টাস গাছের চারা তৈরিসহ বাজারজাত অব্যাহত রেখেছে। উত্তরাঞ্চলে হাট বাজারগুলোতে অন্যান্য পণ্যের মতো নার্সারি থেকে ইউক্যালিপ্টাস গাছের চারা বিক্রি করা হয়। দেখতে খুবই স্মার্ট এবং সস্তা এই চারা। কৃষকরা কেনা বেচা শেষে বাড়ি ফেরার পথে এই গাছের চারা নিয়ে জমির আইলে, কৃষি ক্ষেতের পাশে এবং পতিত জমিতে রোপণ করছে।

ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নামিয়ে দেয় ইউক্যালিপ্টাস : উদ্ভিদবিদদের মতে, ইউক্যালিপ্টাস গাছ ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নামিয়ে দেয় যা পানির সামান্য উৎসকেও নিঃশেষ করে দেয়। ইউক্যালিপ্টাস গাছের শ্বসনে কার্বন-ডাই-অক্সাইড ত্যাগের মাত্রা বেশি। ফলে এই গাছের নিচে অন্য কোনো গাছ জন্মায় না। পানির স্তর কমানোর কারণে ইউক্যালিপ্টাস জমির উর্বরতা শক্তি নষ্ট করে। ইউক্যালিপ্টাস গাছের ফুলের রেণু নিঃশ্বাসের সাথে দেহে প্রবেশ করলে অ্যাজমা হয়। ইউক্যালিপ্টাস গাছের পাতা মাটির জন্য ক্ষতিকর। মাটিতে পড়ার পর পাতার পচনেও অপেক্ষাকৃত বেশি সময় লাগে, যা মাটি ভেদ করে পানি ভূগর্ভে যেতে বাধার সৃষ্টি করে।

উদ্ভিদ বিষেজ্ঞদের মতে, কৃষি জমি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য পানি খেকো গাছের চারা উৎপাদন ও লাগানো বন্ধে সরকারিভাবে উদ্যোগ নিয়ে রোপন বন্ধে প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য ফলদ ও ওষুধি গাছ রোপনের পাশাপাশি ইউক্যালিপ্টাস গাছের ক্ষতিকর দিকগুলো চাষীসহ মানুষকে জানাতে হবে। অন্যথায় অদূর ভবিষ্যতে পরিবেশের ভারসাম্যের উপর প্রাণঘাতি আঘাত হানবে।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবদুল আজিজ জানালেন, ইউক্যালিপ্টাস গাছ আশপাশের প্রায় ১০ ফুট এলাকার পানি শেষণ করে এবং আকাশে উঠিয়ে দেয়। এই গাছ রাতদিন ২৪ ঘণ্টাই পানি শেষণ করে বাতাসে ছেড়ে দেয়। জমির আইল, কৃষি জমি ও পতিত জমিতে এই গাছ লাগানোর কোনো মানে নেই, বরং ক্ষতিকর। এই গাছের আশপাশে কোনো গাছ জন্মাতে পারে না। ইউক্যালিপ্টাস গাছ মাটি শুকিয়ে ফেলে এবং জমির উর্বরতা কমে যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একই বিভাগের শিক্ষক ড. মোহাম্মদ আল মোজাদ্দেদী আলফেছানী জানান, ইউক্যালিপ্টাস অতি দ্রুত বর্ধনশীল বিদেশি প্রজাতির বৃক্ষ। এটি মাটির ৫০ ফুট নিচে পর্যন্ত পানি শোষণ করে বাতাসে ছেড়ে দেয়। যে কারণে মাটিতে পানি শূন্যতা সৃষ্টি হয়। ইউক্যালিপ্টাস গাছের শিকড় এতো বেশি বৃদ্ধি পায় যে এই গাছের পাশে ধান গাছ থেকে শুরু করে অন্য কোনো প্রজাতির গাছ টিকতে পারে না। এই গাছের কাঠের গুণাগুণ ভালো হয় না। এটি মাটির গুণাগুণ এবং উর্বরতা নষ্ট করে। মাটি এক সময় চুনা মাটি হয়ে যায়। আর ইউক্যালিপ্টাস গাছ কেটে ফেললে মাটির উর্বরতা ফিরে আসতে দীর্ঘ সময় লাগে। ইউক্যালিপ্টাস গাছ অধিক পরিমাণে খাদ্য উৎপাদন করার কারণে অধিক পরিমাণে কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গমণ করে। কৃষি জমি ও বাড়ির অঙ্গিনায় ইউক্যালিপ্টাস গাছ বর্জন করা উচিত। কৃষি জমি রক্ষা করতে হলে ইউক্যালিপ্টাস বর্জন করতে হবে।

তিনি বলেন, আমাদের ভাবা উচিত বিভিন্নভাবে কম খরচে কিভাবে বৃক্ষ রোপন করা যায়। অধিকপরিমানে ফলদ ও বনজ বৃক্ষ রোপন করা যায়। বনায়নের জন্য দেশি ফলদ বৃক্ষ বেছে নিলে একদিকে যেমন ফল পাওয়া যাবে অন্যদিকে তেমন মূল্যবান কাঠও পাওয়া যাবে। সৌজনে: দৈনিক নয়া দিগন্ত

Show More

News Desk

তিস্তা নিউজের নিউজ রুম থেকে সমস্ত বিভাগসহ বাংলাদেশের সর্বশেষ সংবাদ প্রকাশ করা হয়। আপনি যদি তিস্তানিউজ ২৪.কম এ প্রকাশের জন্য আমাদের ট্রেন্ডিং নিউজ প্রেরণ করতে চান তবে আসুন এখনই আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন। আপনার নিউজটি আমাদের নিউজ রুম থেকে নিউজ ডেস্ক হিসাবে প্রকাশিত হবে। আমাদের সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদান্তে- আব্দুল লতিফ খান, সম্পাদক মন্ডলির সভাপতি।

Related Articles

Back to top button
Close