প্রতিবেদন

চাপাতি বনাম চিন্তা, কে হারে কে জেতে!

লেখক ড. মাহবুব হাসান,কবি, সাংবাদিক, লস এঞ্জেলেস প্রবাসী:http://tistanews24.com/wp-content/uploads/2015/11/Untitled-13.jpg

ফয়সাল আরেফিন কে আমি চিনি না, চিনতাম না, দীপনকে আমি চিনতাম। চিনতাম, কারণ সে আমার শিক্ষক অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হকের ছেলে। আমরা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তখন দীপন ছোটো ছেলে। আমরা কয়েক বন্ধু প্রায়ই ওদের বাসায় যেতাম। নম্র এবং ভদ্র ছেলেটিকে আমি পছন্দ করতাম। তো, সেই নম্র-স্বভাবের ছেলেটিকেই হত্যা করা হয়েছে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে। কি ছিলো তার অপরাধ? সে অভিজিৎ রায়ের বই ছেপেছিলো, এই অপরাধে কাউকে হত্যা করা যায়? শুধু তাকেই নয়, চাপাতিরা  আরেক প্রকাশক আহমেদুর রশীদ টুটুলকেও কুপিয়ে মারাত্মকভাবে আহত করেছে। টুটুলের সাথে ছিলেন আরও দুজন, তাদেরকেও তারা কুপিয়েছে।
তাদের কি অপরাধ? তারা তাদের চিন্তার সুতোগুলো মেলে ধরে তাদের ব্লগে। সেই লেখাগুলো চাপাতির ভালো লাগে না, তাই সেই চিন্তাগুলোকে কুপিয়ে বরবাদ করে দিয়েছে। কারো লেখা ভালো লাগা না লাগা পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু কারো মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণ করা তো চরম অপরাধ, সেটা কি চাপাতিরা জানে না?
এখন আর চিন্তাশীলদের কোনো চিন্তা-ভাবনার কাজ নেই। সে বা তারা এখন সব চিন্তাভাবনার ওপওে উঠে গেছে। যারা চাপাতির কোপ এখনো খায়নি বা মারা যায়নি, তারাই কেবল চিন্তাভাবনা করতে পারবে। কিন্তু কুচিন্তার সূত্রধর চাপাতিরা তাদেও জীবনের ওপরও পরোয়ানা জারি করে রেখেছে।
চাপাতিরা তাই খুব খুশি। চিন্তার মাথা কেটে ফেলতে পারায় তারা এখন দুশ্চিন্তামুক্ত।
আমার মনে একটা প্রশ্ন জেগেছে, চিন্তাগুলোকে, ভিন্ন চিন্তাগুলোকে চিরতরে শেষ করে দিলেই কি তার মৃত্যু চিরতরে হয়? না, হয় না। সেটা চাপাতি জানে না। জানার কোনো আগ্রহও নেই তাদের। কারণ তারা তো মানুষই না। কোনো মায়ের পেটে ৯ মাস থেকে তাদের জন্ম হয়েছে, এটা মনে হয় না আমার। এই জৈবিক প্রাকৃতিক ধর্মই যেনো তাদের হয়নি। তাহলে কি তারা ভিনগ্রহের প্রাণী! তাই তারা মানুষ নামক প্রাণীর জীবন খতম করতে এতোটা উদগ্রীব? যার মানবিক গুণ আছে, তিনিই তো মানুষ। যার সেই সব গুণ নেই, তিনি অমানুষ। সামাজিক মানুষ তাদের বলেন পশু। আমি তাদের পশুর স্তরেও জায়গা দিতে নারাজ। কারণ অনেক পশুরও রয়েছে অনন্য-সাধারণ ‘মানবিক গুণ, যা আমাদের অনেকেরই নেই।
তো, যা বলতে চাই, সেই কথায় আসি। দীপনকে হত্যা করে দীপনের চেতনার বর্ণমালাকে মুছে দেয়া যাবে না, এটা যদি চাপাতিরা জানতো তাহলে মানুষ হত্যা করা থেকে তারা বিরত থাকতো। চাপাতিরা মানুষ নয়, যারা ভাবছেন তারা ইসলামের রক্ষক, ধর্মের নিশান বরকন্দাজ, তারা নিশ্চয়ই ইসলাম ধর্মের মূল দর্শন থেকে অনেকটাই দূরে সরে এসেছেন। মানুষ হত্যা কওে কেউ অপরাধী হবে না, পৃথিবীর কোনো দেশে এমন আইন নেই। চাপাতিরা এখন অপরাধী।
ইসলাম কেন শান্তির ধর্ম? কারণ ইসলামই প্রমাণ করেছে, ভিন্নধর্মাবলম্বীদের সম্মান করো, তাদের চিন্তার প্রকাশকে জায়গা দাও, তাদের ক্ষমা করে তাদের বুঝতে দাও তারা কোন পথে হাঁটছে। ইসলাম সব ধর্ম রক্ষাকেই শ্রেষ্ঠ কাজ বলে প্রমাণ করেছে। রাসুলআল্লাহ অনেক যুদ্ধে ভিন্ন ধর্মী বন্দীদের কেবল ক্ষমাই করেননি, তাদের সম্মানের সাথে রক্ষা করেছেন। কেন করেছেন? কারণ তিনিও তো ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের আশ্রয় পেয়েছিলেন, যখন তিনি হিজরত করেন মক্কা থেকে মদিনায়। সে সময় তো মদিনায় মুসলিম ছিলো না কেউ। সেখানকার অধিবাসীরা রাসুলআল্লাহকে সসম্মানে বরণ করেন এবং তাকে বসবাসের সহযোগিতা করেন। তাই কেবল নিজেদের খাঁটি মানুষ, আর ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা নয়, এটা ভাবা মূর্খতা। এটা কেবল চাপাতিরাই করতে পারে। কারণ তাদের ভাবনার কোনো রাজপথ নেই, আছে কানা-চোরা গলি। যেখানে চাপাতির প্রধান কাজ চাপাতি চালানো।
২.
লস এঞ্জেলেস প্রবাসী মুজিবুর রহমান খোকা, যিনি বিদ্যাপ্রকাশের মালিক, তিনি আমাকে বললেন দীপনের স্বভাব ও অনন্য মানবিক গুণের কথা। নম্র স্বভাবের দীপনও মালিক ছিলো জাগ্রতি প্রকাশনীর, এই অসম বয়সী দুই জনের মধ্যে একটা মধুর সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো। আমাকে সেটাই জানালেন মজিবর রহমান খোকা। ছিলো, কারণ দীপন আর এ-পৃথিবীতে নেই। তাই বেদনায় তিনি নীল হয়ে গেছেন। তাহলে ভাবুন, দীপনের বাবা, আমার শিক্ষক পুত্রশোকে কতোটা কাতর হয়েছেন। আজ যারা চাপাতি চালিয়ে মানুষ মারছে, তাদেও বাবা-মা-কেও যদি অন্য কোনো চাপাতিরা প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে এভাবেই মেওে ফেলে, তাহলে কি তাদেও মনে কোনো দুঃখ বোধ জাগবে? কে জানে? মানুস হলে অবশ্যই জাগবে। আর অমানুষ হলে জাগবে না।

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক কেন পুত্র হত্যার বিচার চাননি, সেটা খুবই একটি সহজ এবং স্বাভাবিক কারণে। তিনি জানেন এই রাষ্ট্র, সরকার[গুলো] এই রাষ্ট্রের আইন-আদালত হত্যাকারীদের বিচার করে না, করতে পারে না। এ-পর্যন্ত যত ভিন্ন চিন্তার মানুষকে চাপাতিরা খুন করেছে, সেই সব অপরাধীদের বিচার করা হয়নি।  আইনও লালন করে অপরাধীদের। যে সব আইন চলছে দেশে বা সচল আছে, সেগুলোর গোড়া ১৮৩৫ সালের ভারত শাসন আইন। ওই আইন বানিয়েছিলো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি, তাদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে, অপরাধীদের আইনের আওতার বাইরে সুকৌশলে বাঁচিয়ে রাখতে, ক্ষমতাসীনদের অব্যাহত অপরাধকে টিকিয়ে রাখতে নানা প্যাচসমেৎ ওই সব আইন প্রণীত হয়েছিলো। ওই সব আইনের মারপ্যাচগুলো সমেৎ আজো বাংলাদেশে চলছে। বাংলাদেশ যে মুক্তিযুদ্ধেও ভেতর দিয়ে জন্ম নিয়েছে তা ওই সব আইন কার্যকর থাকায় বোঝা যায় না। কারণ ওই সব আইন পরাধীনতার আইন। স্বাধীনতার আইন নয়। মানুষকে পরাধীন কওে রাখার জন্য ব্রিটিশ-মেধাবানরা ওই সব আইন করেছিলো। আমরা না বুঝে সেই সব ব্রিটিশ আইনই চালু রেখেছি। যেমন চালু রেখেছি ব্রিটিশ বুরোক্রাসির এ-দেশীয় প্রশাসন। আমাদেও দেশে আইনের স্বাধীনতাকে যেমন  পরাধীন করে রাখা হয়েছে, তেমনি প্রশাসন ব্যবস্থাটিকেও সাম্রাজ্যবাদিদেও অবশেষ হিসেবে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। ফলে এদেশের স্বাধীন মানুষ প্রকৃত প্রস্তাবে কোনো রকম ন্যায় বিচার পায় না। যারা বিচারক, তারাও ন্যায় বিচার করতে পারেন না। কারণ ওই পরাধীন আইন।
আজ সেই সব আইনেরই ছায়া-অপছায়া সমেৎ বাংলাদেশে চলছে। এই আইন দিয়ে তো চাপাতিদের বিচার করা যাবে না। কারণ চাপাতিরা ধর্মের মুখোশ এঁটে আছে। তাই তাদের চেহারা দেখতে পায় না আইন বা পুলিশ বা সরকার।
বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হয়েছে। কিন্তু আসল কুশিলবরা বিচারের বাইরেই রয়ে গেছে। জেলহত্যার বিচার আজো হয়নি। প্রেসিডেন্ট জিয়া হত্যার বিচার হয়নি। জিয়াকে হত্যার অপরাধে যাদেরকে দোষী সাব্যস্ত করে কোর্ট মার্শালে বিচার করা হয়েছে, তাতে ঢাকা পড়েছে পেছনের কুশিলবদের নোংরা মুখ। জেনারেল  মন্জুর হত্যার বিচারও হয়নি। এ-রকম বহু হত্যারই বিচার হয়নি।
প্রথম ব্লগার হত্যার পর স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তাকে ‘শহীদ’ মর্যাদা দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই মামলার কোনো কিনারা হয়নি।  যেখানে প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং  চাইছেন বিচার হোক, কিন্তু কোন অদৃশ্যমক্তির রহস্যময়তায় ঢাকা পড়েছে সেই বিচারের পথ। তার পরের ব্লগার হত্যাগুলোরও কোনো বিচার হয়নি বা কিনারা মেলেনি।
তাই অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক ছেলে হত্যার বিচার চান না। বিচার করা হবে না কোনোদিন—- তাই এই বিচার না চাওয়ার মাধ্যমে তিনি প্রতিবাদ করেছেন।

ড. মাহবুব হাসান : কবি, সাংবাদিক, লস এঞ্জেলেস প্রবাসী

Show More

News Desk

তিস্তা নিউজের নিউজ রুম থেকে সমস্ত বিভাগসহ বাংলাদেশের সর্বশেষ সংবাদ প্রকাশ করা হয়। আপনি যদি তিস্তানিউজ ২৪.কম এ প্রকাশের জন্য আমাদের ট্রেন্ডিং নিউজ প্রেরণ করতে চান তবে আসুন এখনই আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন। আপনার নিউজটি আমাদের নিউজ রুম থেকে নিউজ ডেস্ক হিসাবে প্রকাশিত হবে। আমাদের সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদান্তে- আব্দুল লতিফ খান, সম্পাদক মন্ডলির সভাপতি।

Related Articles

Back to top button
Close

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker