জাতীয়নীলফামারী

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন সংগ্রাম ও একজন মোনাজাতউদ্দিনের অপেক্ষা

আশির দশকে দেশের সংবাদপত্র জগতের প্রায় সবাই মোনাজাতউদ্দিনকে চিনতেন একজন চারণ সাংবাদিক হিসাবে। তিনি ছিলেন দৈনিক সংবাদের উত্তরাঞ্চলীয় প্রতিনিধি। খবরের বিষয় বৈচিত্র্য, উপস্থাপনা ও গভীরতা তাকে বিশেষত্ব দিয়েছিল। সংবাদ পরিবেশনে তিনি একটি নিজস্ব স্টাইল অনুসরণ করতেন। যেটিকে বলা হোত মোনাজাতীয় স্টাইল। রাজধানী ঢাকার বাইরে কেবল তিনিই সংবাদ পরিবেশনে একটি নতুন ধারার সূচনা করেন।পরে তার এই ধারা অনুসরণ করেছেন অনেকে।

উত্তরের আট জেলা ছিল মোনাজাতউদ্দিনের চারণ ভূমি। শিক্ষা,শিল্প-কারখানা,ব্যবসা-বাণিজ্যসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে পিছিয়ে ছিল এই আট জেলা। বছরের একটি বিশেষ সময় অর্থাৎ আশ্বিন-কার্তিক মাসে এই অঞ্চলের মানুষের হাতে কোন কাজ থাকতো না। ফলে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটতো লাখো মানুষের। কেতাবি ভাষায় ওই পরিস্হিতির নাম দেয়া হয়েছিল “মঙ্গা” বলে।
সময়টা ছিল এরশাদ জমানার। মঙ্গা নিয়ে মোনাজাতউদ্দিনের অসংখ্য রিপোর্ট, অনুসন্ধানীমূলক প্রতিবেদন, ধারাবাহিক খবর নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছে দৈনিক সংবাদে। এতে অনেক সময় নড়েচড়ে উঠেছে তৎকালীন স্বৈরশাসকের প্রশাসনযন্ত্র। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী বাহাদুর হেলিকপ্টারে উড়ে গেছেন উপদ্রুত একালায়। ফলে অনাহারী মানুষ পেয়েছে ত্রাণ, খাদ্য। অসুস্হ মানুষদের চিকিৎসার জন্য বসেছে মেডিকেল ক্যাম্প। সরকার প্রচার মাধ্যমে প্রেসনোট দিয়ে বলতে বাধ্য হয়েছে পরিস্হিতি স্বভাবিক । কোথও খাদ্য ঘাটতি নাই।

সে সময় খুব অল্প কয়েকটি জাতীয় দৈনিক প্রকাশিত হতো ঢাকা থেকে। এর মধ্যে প্রচার সংখ্যার শীর্ষে ছিল দৈনিক ইত্তেফাক। আর দ্বিতীয় অবস্হানে ছিল সংবাদ। দৈনিক সংবাদকে বলা হোত মধ্যবিত্ব ও বোদ্ধাশ্রেণীর পাঠকদের পত্রিকা। সেসময় রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে একদল চৌকস সংবাদকর্মী পত্রিকাটিতে যোগ দেয়ায় এর প্রচার সংখ্যা দিন-দিন বাড়ছিল। আর উত্তারাঞ্চলের বিভিন্ন জনপদ থকে নিয়মিত মোনাজাতউদ্দিনের সরেজমিন প্রতিবেদন প্রকাশ পাওয়ায় কোন-কোন এলাকায় দৈনিক সংবাদ প্রচার সংখ্যার শীর্ষে চলে যায়। সম্ভবত এ কারণে মোনাজাতউদ্দিনই একমাত্র সাংবাদিক,যাকে দেশের যে কোন প্রান্ত থেকে খবর সংগ্রহের অনুমতি দিয়েছিল সংবাদ কর্তৃপক্ষ। সে সময়ের সংবাদ পাঠকরা দেখেছেন এই পঞ্চগড় ডেটলাইন থেকে মোনাজাতউদ্দিনের নামে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। দু’দিন পর গাইবান্ধা,তার তিন-চার দিন পর হয় কুমিল্লা না হয় বরিশাল থেকে নিউজ কভার করছেন তিনি। এভাবে সংবাদের জন্য সারা দেশ চড়ে বেড়িয়েছেন মোনাজাতউদ্দিন। তাইতো তার নামের সাথে যুক্ত হয়েছে ‘চারণ’ শব্দটি।

সংবাদের খোঁজে বহু বার সৈয়দপুরে এসেছেন মোনাজাতউদ্দিন। সে সময় দৈনিক সংবাদের সৈয়দপুর প্রতিনিধি ছিলেন আমিনুল হক। পরে তিনি একই পত্রিকার নীলফামারী জেলা বার্তা পরিবেশক পদে পদোন্নতী পান। এ অঞ্চলের অনেক সাড়া জাগানো রিপোর্ট মোনাজাতউদ্দিন ও অমিনুল হকের যৌথ নামে প্রকাশিত হয়েছে।
নীলফামারী অঞ্চলে সংবাদের খোঁজে আসলে মোনাজাতউদ্দিন রাত যাপন করতেন সৈয়দপুরে। এখানে থাকলেই রাতে প্রেসক্লাবে বসতো তাকে নিয়ে স্হানীয় সংবাদকর্মীদের আড্ডা। সে আড্ডায় অংশ নিতেন সিনিয়র সাংবাদিক আমিনুল হক,প্রায়াত সাংবাদিক ইসরার আহমদ,প্রায়াত আব্দুর রহিম, মো. নজরুল ইসলাম ও কাজী জাহিদ। আড্ডার আলোচনায় পুরো অংশ জুড়ে থাকতো সাংবাদিক -সংবাদপত্র প্রসঙ্গ । সেসময় সৈয়দপুরে সক্রিয় সংবাদকর্মীর সংখ্যা ছিল হাতে গোনা পাঁচ-ছয় জনের মত।

যারা ব্যক্তি মোনাজাতউদ্দিনকে চিনতেন তারা জানেন তিনি ছিলেন অত্যন্ত মৃদুভাষি। প্রয়োজনের অতিরিক্ত একটি কথাও বলতেন না। বসে-বসে সবার কথা শুনতেন। আবার সংবাদ বা সংবাদপত্র প্রসঙ্গ উঠলেই সরব হয়ে উঠতেন মৃদুভাষি এই মানুষটি। কি কৌশলে পদস্হ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তথ্য বের করে এনেছেন,কোথায় সংবাদ সংগ্রহে গিয়ে বিড়ম্বনায় পড়েছেন ইত্যাদি। এসবই ছিল আলোচনার মূল বিষয়। ঘন্টার পর ঘন্টা সে আলোচনা চলতো।
তবে একই পত্রিকার স্টাফ হওয়ায় সৈয়দপুরের সিনিয়র সাংবাদিক আমিনুল হকের সাথে মোনাজাতউদ্দিনের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ট। বয়সের দিক দিয়েও দুজন ছিলেন প্রায় কাছাকাছি। আমিনুল হক দৈনিক সংবাদের স্টাফ রিপোর্টার পদে পদোন্নতী পাওয়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল মোনাজাতউদ্দিনের। এ প্রসঙ্গে আমিনুল হক বলেন, ১৯৮৫ সালে সারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ১৫ জন প্রতিনিধিকে স্টাফ রিপোর্টার পদে পদোন্নতি দেয় সংবাদ কর্তৃপক্ষ। পরে এদের প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্হা করা হয়। যাদের মধ্যে আমি একমাত্র রিপোর্টার যে মোনাজাতউদ্দিনের সাথে দীর্ঘ প্রশিক্ষণের সুযোগ পেয়েছিলাম। যেটি পরবর্তিতে দৈনিক যুগান্তর ও সমকালের উত্তরাঞ্চলীয় প্রতিনিধি নিয়োগে সহায়ক হয়েছে।
বর্তমানে বাংদেশের সংবাদ ক্ষেত্র অনেক বিস্তৃত। প্রিন্ট মিডিয়া ছাপিয়ে অনেক ক্ষেত্রে স্হান করে নিয়েছে ইলেক্ট্রোনিক্স মিডিয়া তথা টেলিভিশন সাংবাদিকতা। এর সাথে যুক্ত হয়েছে অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ফেসবুক ও ইউটিউব ভিত্তিক নেট টিভি প্রভৃতি।

সৈয়দপুরে সাংবাদিকর্মীর সংখ্যা প্রায় পঞ্চাশেরও বেশী। আর নামধারী সাংবাদিকের সংখ্যাও প্রায় সমপরিমাণ। শুধু সৈয়দপুর কেন সারা বাংলাদেশের জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সাংবাদিকতার অবস্হা তথৈবচ। সাংবাদিকের সংখ্যা বাড়ছে গাণিতিক হারে । কিন্তু প্রশ্ন হলো সেই অনুপাতে বাড়ছে কী সাংবাদিকতার গুনগত মান। তৈরী হয়েছেন কী আর একজন চারণ সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন? যিনি পথেপথে ঘুরে তুলে আনবেন প্রান্তিক মানুষের জীবন-জীবীকা ও অস্বিত্ব টিকিয়ে রাখার সংবাদ।

পুনশ্চঃ খুব অল্প সময় মোনাজাতউদ্দিনের সাথে মেশার সুযোগ হয়েছিল আমার। এ সময় তাঁকে যেমনটি দেখেছি সে অভিঞ্জতা। এ ছাড়াও পত্র-পত্রিকা থেকে তার সম্পর্কে যতটুকু জেনেছি তার ভিত্তিতে আমার এই লেখা। আমার জানায় সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে, তাই যদি কোন তথ্য বিভ্রাট হয়ে থাকে তবে সদাসয় পাঠক কমেন্টসে শুধরে দিলে কৃতার্থ হবো। লেখক— মো.নজরুল ইসলাম,সাংবাদিক,সৈয়দপুর।

Show More

News Desk

তিস্তা নিউজের নিউজ রুম থেকে সমস্ত বিভাগসহ বাংলাদেশের সর্বশেষ সংবাদ প্রকাশ করা হয়। আপনি যদি তিস্তানিউজ ২৪.কম এ প্রকাশের জন্য আমাদের ট্রেন্ডিং নিউজ প্রেরণ করতে চান তবে আসুন এখনই আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন। আপনার নিউজটি আমাদের নিউজ রুম থেকে নিউজ ডেস্ক হিসাবে প্রকাশিত হবে। আমাদের সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদান্তে- আব্দুল লতিফ খান, সম্পাদক মন্ডলির সভাপতি।

Related Articles

Back to top button
Close