নীলফামারী

মাইক ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ নেই, মাত্রাতিরিক্ত শব্দ দূষণের কবলে সৈয়দপুর শহর

মিজানুর রহমান মিলন সৈয়দপুর (নীলফামারী) প্রতিনিধি: সৈয়দপুরে বেড়েই চলেছে উচ্চ আওয়াজে মাইক ব্যবহারের প্রবণতা। যাচ্ছেতাইভাবে মাইক ব্যবহারের ফলে শব্দদূষণে অতিষ্ঠ শহরবাসী। পাশাপাশি উচ্চ আওয়াজের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটছে। শব্দ দূষণের কারণে দূর্ভোগ পোহাচ্ছেন রোগীরা। অথচ দেশে শব্দ দূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা থাকলেও বিধি লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না। এদিকে শব্দ দূষণ আতংকে রয়েছে এইচএসসি পরীক্ষার্থী ও ধর্মপ্রাণ মানুষেরাও।
সূত্র মতে, ঘনবসতি ঘিঞ্জি সৈয়দপুর শহরে দিনে-রাতে শোক সংবাদ, সুখবর, ডাক্তার রোগী দেখছে, পণ্য বিক্রি, ধর্মীয় ওয়াজ-অনুষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রচার, মসজিদ, মন্দির নির্মাণ ও ধর্মীয় কাজে দান সংগ্রহ, নতুন প্রতিষ্ঠান উদ্বোধন, রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের সভা-সমাবেশে উচ্চশব্দে মাইক ব্যবহার হচ্ছে। এমনকি বহুসংখ্যক মাইক টাঙ্গিয়ে প্রচার চালানো হয় অনুষ্ঠানস্থল ছাড়াও জনাকীর্ণ বাজার বা আবাসিক এলাকায়। উচ্চ হর্ণের এসব মাইকের শব্দে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনজীবন। অথচ শব্দ দূষণের যন্ত্রণা লাঘবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নেই কোন প্রয়োজনীয় উদ্যোগ।
এদিকে সৈয়দপুর শহরে রয়েছে অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী ও পরীক্ষার্থী প্রতিনিয়ত শব্দ দূষণের শিকার হচ্ছে। আগামী ১ এপ্রিল থেকে সারাদেশের মত সৈয়দপুরেও শুরু হচ্ছে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা। ওই পরীক্ষা উপলক্ষে হাজার হাজার পরীক্ষার্থী পড়াশোনায় মগ্ন থাকবে। প্রস্তুতি হিসেবে গোটা মার্চ মাসেই পড়াশোনায় ব্যস্ত থাকবে তারা। কিন্তু উচ্চ শব্দে মাইক ব্যবহারের কারণে শব্দ দূষণের আতংকে ভুগছে তারা।
এইচএসসি পরীক্ষার্থী তামান্না নাজ, সুমাইয়া আকতার ও সৈকত জানান, শব্দ দূষণের কারণে তাদের পড়াশোনায় মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটছে। তারা উচ্চ শব্দে মাইক ব্যবহার বন্ধে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। আগামী ১ এপ্রিল থেকে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর ২৫ এপ্রিল থেকে শুরু হচ্ছে পবিত্র রমজান (চাঁদ দেখা সাপেক্ষে)। রমজান মাসে এবাদত বন্দেগিতে রোজাদারদের সমস্যা হবে উচ্চ আওয়াজে মাইক ব্যবহারের কারণে। তাই ওই মাসে মাইক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন বলে সচেতন মহলের অভিমত।
এদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে শব্দদূষণ রোধে কোন ব্যবস্থা না নেয়ায় অনুষ্ঠান আয়োজনে নিয়ম মানার কোন বালাই নেই সৈয়দপুরে। গভীর রাত পর্যন্ত চলা অনুষ্ঠানের মাইকের উচ্চ আওয়াজে মানুষজনের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছে। এছাড়া শিশু রোগী ও প্রবীণরাও শব্দ যন্ত্রণায় নাজেহাল হচ্ছেন।
সৈয়দপুর শহরের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও স্কুল ছাত্রীর বাবা শহীদুল ইসলাম ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, প্রতিদিনই উচ্চ শব্দে মাইক ব্যবহারের ফলে তার সনাতনসহ অন্যান্য শিক্ষার্থীরা তাদের পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারছে না। ফলে তাদের শিক্ষা জীবন ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। বিশেষ করে শোক সংবাদ, রোগীদের জন্য সুখবর ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের নামে শব্দ দূষণে চলছে নৈরাজ্য। গভীর রাত পর্যন্ত চলা উচ্চ শব্দে মাইক ব্যবহার জনদুর্ভোগে পরিণত হয়েছে।
পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে দিনের বেলা ৫৫ ডেসিবল এবং রাত ৯টার পর ৪৫ ডেসিবল অতিক্রম করা যাবে না বলে উল্লেখ রয়েছে। কেউ তা অতিক্রম করলে জরিমানার বিধান রয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলার বিষয়টি সম্পর্কে মানুষ অবগত নয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক সহকারি পরিচালক ও ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার (ডিপিএম) বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. সিরাজুল ইসলাম বলেন, শব্দদূষণের কারণে মানুষের শ্রবণ শক্তি কমে যায়। হৃদরোগীদের ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেয় উচ্চমাত্রার শব্দ। শব্দ দূষণ অনেক সময় মানুষের মস্তিষ্কে আঘাত হানে, যা থেকে ব্রেইন হ্যামারেজের শিকার হতে পারেন যে কেউ। সৈয়দপুর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, দিন দিন শব্দের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। উচ্চ শব্দের কারণে ক্লাশ রুমে অবস্থান করা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগ কেড়ে নেয়। শব্দদূষণ থেকে রেহাই পেতে সংশ্লিষ্টদের হস্তক্ষেপ কামনা করে বিষয়টি নিয়ে জনপ্রতিনিধিদেরও এগিয়ে আসা উচিত বলে তিনি মনে করেন।
শব্দদূষণের কারণে সকলেই ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন, যা মানবাধিকার লংঘনের সামিল। তাই নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নেতা মো. রুহুল আলম মাস্টার বলেন, শব্দদূষণ বন্ধে উদ্যোগ নিতে পারে পৌর পরিষদ। বিশেষ করে মাইক ব্যবহারের সঙ্গেই যারা জড়িত তাদের সচেতন করার পদক্ষেপ নিতে হবে। অনুমতি ছাড়া মাইক ভাড়ার ব্যাপারে বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারলে ভালো ফলাফল পাওয়া যাবে।
জানতে চাইলে, সৈয়দপুর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অশোক কুমার পাল শব্দদূষণের কথা স্বীকার করে বলেন, নিয়ম মেনে মাইক ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাধা নেই। তবে উচ্চমাত্রার শব্দে মাইক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। পৌরসভাসহ অন্যান্য কর্তৃপক্ষ শব্দূষণ রোধে পুলিশের সহযোগিতা চাইলে তা অবশ্যই দেয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নাসিম আহমেদ বলেন, উচ্চ আওয়াজে মাইক ব্যবহার করে শব্দদূষণ করা মারাত্মক অপরাধ ও সমস্যা। এ নিয়ে উপজেলা প্রশাসনের সভায় আলোচনা হয়েছে। পৌরসভাকে এ বিষয়ে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য চিঠি দেয়া হবে প্রয়োজনে উপজেলা প্রশাসন পৌরসভাকে সার্বিক সহযোগিতা করবে।
সৈয়দপুর পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত মেয়র মো. জিয়াউল হক জিয়ার সাথে এ বিষয়ে কথা হলে তিনি শব্দদূষণের মাত্রা বৃদ্ধির সত্যতা স্বীকার করে বলেন, মাইক ব্যবহারে অনুমতির বিধান থাকলেও কেউ অনুমতি নেন না। শহরে মাইক ব্যবহারে নৈরাজ্য চলছে। এজন্য সবাইকে সচেতন হতে হবে এবং পৌর পরিষদের পরবর্তী সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে একটি সিদ্ধান্তে আসা হবে।

Show More

News Desk

তিস্তা নিউজের নিউজ রুম থেকে সমস্ত বিভাগসহ বাংলাদেশের সর্বশেষ সংবাদ প্রকাশ করা হয়। আপনি যদি তিস্তানিউজ ২৪.কম এ প্রকাশের জন্য আমাদের ট্রেন্ডিং নিউজ প্রেরণ করতে চান তবে আসুন এখনই আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন। আপনার নিউজটি আমাদের নিউজ রুম থেকে নিউজ ডেস্ক হিসাবে প্রকাশিত হবে। আমাদের সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদান্তে- আব্দুল লতিফ খান, সম্পাদক মন্ডলির সভাপতি।

Related Articles

Back to top button
Close