আন্তর্জাতিকওপারবাংলা

  মুক্তিযুদ্ধ, জয়বাংলা’র পক্ষের নীরব যোদ্ধা হলদিবাড়ির প্রিয়মুখ মন্জু ভাই চলে গেলেন

“সালেম সুলেরী”: একাত্তরের যুদ্ধবর্ষে আমাদের পলাতক জীবনে প্রথম পরিচয়। পশ্চিমবঙ্গের হলদিবাড়িতে ওনাদের পাশেই থাকতাম আমরা। ওনাদের পরিবার আমাদের শরণার্থী পরিবারকে অনেক সাহায্য করেছে। ওনার মা আর আমার আম্মা- বেশ খাতির ছিলো। কোচবিহারের সেই হলদিবাড়িতেই পৈতৃকবাস। ওনার বয়েস তখন ১৪-১৫ বছর হবে।আমাদের থেকে ৫ বছরের জ্যেষ্ঠ। ওনার বাবা ছিলেন চিকিৎসক, মা রাজনীতিক। ঢাকায় স্থায়ীভাবে স্থিত হন  আশির দশকে। অতঃপর আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ। ফুপাতো বোন তানী আপাকে বিয়ে করেছিলেন। আপা ‘গায়িকা তানী প্রধান’ নামে হলদিবাড়িতে পরিচিত ছিলেন। আর ভীষণ ভালো মানুষ ছিলেন সেই মন্জু ভাই। পুরো নাম মন্জুল মোরশেদ প্রধান। খ্যাতিমান পল্লীচিকিৎসক ‘প্রধান ডাক্তারে’র আদুরে সন্তান। আমার ফুপা কবির হোসেন প্রধানের নিকটাত্মীয়। ফুপা পরিবারসহ থাকতেন সাত কিলো দূরবর্তী প্রধান পাড়ায়। হলদিবাড়ি শহরের পরিত্যক্ত বাড়িটিতে আমরা ছিলাম আশ্রিত। যুদ্ধবর্ষে বৃহত্তর রংপুরের ডোমার, নীলফামারী থেকে পলায়নকৃত। বয়েসে তানী আপার দু’বছরের ছোট মন্জু ভাই। একাত্তরে দেখেছি উনি দু’হাতে তবলা বাজাতেন। তানী আপা অনেক অনুষ্ঠানে গাইতে যেতেন। মফস্বলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসমূহে বেশ ডাক পড়তো। বছরের মাঝামাঝি ‘জয়বাংলা’র গানের জয়জয়কার। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ভারতের শিল্পীরাও সোচ্চার। ‘জয় বাংলা বাংলা’র জয়’ গানটিই বেশি চলতো। হলদিবাড়ির স্থানীয় শিল্পীরা সমবেতভাবে গাইতেন। তানী আপা রিহার্সেলে আমাকে অনেক নিয়েছেন। তবলায় সঙ্গত করার জন্যে ডাকতেন মন্জু ভাইকে। তুই-তোকারি সম্বোধনে কথা বলতেন। হঠাৎ হঠাৎ অনুষ্ঠানের আয়োজন হতো। শরণার্থীদের অর্থ সাহায্যের জন্যে ‘চ্যরিটি শো’। কোথাও ডাক পড়লে  আমিও সঙ্গী হতাম। আর তানী আপা বলতো, যা মন্জুকে ডেকে আন।  আমি খুঁজতাম স্কুলে, ক্লাবে, হলদিবাড়ি মাজারে। আমাকে দেখেই বলে উঠতেন– কি খবর ‘স্বাধীনবাংলা’! যদি বলতাম যেতে হবে, অনুষ্ঠান আছে– — কি, জয়বাংলা’র কোন গান হবে? — জ্বি, জ্বি চলেন। চ্যারিটি  আছে, আপা ডাকছে। চ্যারিটি মানে জয়বাংলা’র মানুষদের পক্ষে অনুষ্ঠান। আর বিলম্ব নয়, আমার সাথে হাঁটা দিতেন। বলতেন, গান দিয়ে আমরাও যুদ্ধ করি, কি কও। কানে কানে বলতেন, এক প্যাকেট ‘চারমিনার’ দরকার। — কি বলেন, আপনি সিগারেট খান? –আরে আমি না, হাইস্কুল কমিটির সেক্রেটারী। ঘন ঘন স্কুল কামাই দেই তো। ওনাকে হাতে রাইখতে হয়, বুঝলা! হাজিরা খাতায় বেশি অ্যাবসেন্ট থাকলে ফাইনাল পরীক্ষায় আউট। তখন গান-বাজনা-জয়বাংলা ধূতির নিচে ঢুকায় দিবে…। কৈশোরের কতো শতো স্মৃতি মন্জু ভাইকে নিয়ে। ভারতীয় হলেও আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কতো আন্তরিক।আমাদের স্বাধীনতার নেপথ্যে এমন কতো নীরব অবদান! প্রতিবেশী অনুজ থেকে তানী আপার স্বামী হয়েছিলেন। সেটির নেপথ্যেও সেবামূলক মনোভাব। তানী আপার প্রথম বিয়ে টিকলো না। বন্যা নামের শিশু কন্যাটিকে নিয়ে কি যে টানাটানি। ঢাকায় তানী আপার দুর্যোগময় দিন তখন। সাহারা দিতে এগিয়ে এলেন দরদী মন্জু ভাই। মানবিক মন থেকে অসম প্রেম, বিয়ে। একদা রেজা দুলাভাইদের প্রকৌশল-প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজার ছিলেন। কন্ঠশিল্পী ফেরদৌসী রহমানের স্বামী রেজা দুলাভাই। সম্পর্কে মন্জু ভাইও আমার (ফুপাতো) ভগ্নিপতি। তবে কখনো দুলাভাই ডাকিনি। পরে তিনি নিজেই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হন। সর্বশেষ দেখা ঢাকায় ছেলের বিয়ের অনুষ্ঠানে। পুত্র মিরন, বৌমা– দুজনই ঢাকায় ব্যাংক কর্মকর্তা। দারুণ স্মৃতিময় সম্মিলনী ছিলো– বিবাহ উৎসবটি। যদিও মন্জু ভাই কিছুটা অসুস্থ ছিলেন বলে জানান। অবশেষে ২০২০-এর ২৯ জানুয়ারি চলে গেলেন। প্রিয় তানী অাপাটি অকালে বিধবা হলেন। স্মৃতিময় একটি বিশাল অধ্যায়ের অবসান ঘটলো। বিদেহী আত্মার স্বর্গীয় প্রশান্তি কামনা করি। শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা।

Show More

News Desk

তিস্তা নিউজের নিউজ রুম থেকে সমস্ত বিভাগসহ বাংলাদেশের সর্বশেষ সংবাদ প্রকাশ করা হয়। আপনি যদি তিস্তানিউজ ২৪.কম এ প্রকাশের জন্য আমাদের ট্রেন্ডিং নিউজ প্রেরণ করতে চান তবে আসুন এখনই আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন। আপনার নিউজটি আমাদের নিউজ রুম থেকে নিউজ ডেস্ক হিসাবে প্রকাশিত হবে। আমাদের সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদান্তে- আব্দুল লতিফ খান, সম্পাদক মন্ডলির সভাপতি।

Related Articles

Back to top button
Close