বৃহত্তর রংপুর

রংপুরের পীরগঞ্জের উন্নয়নে পিছিয়ে নেই নারীরা, অনেকেরই তারা অনুকরণীয়

সরকার বেলায়েত, পীরগঞ্জ, রংপুর থেকে ॥ রংপুরের পীরগঞ্জের উন্নয়নে পিছিয়ে নেই নারীরা। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে বসবাসকারী নারীরা নিজেদের সংসার উন্নয়নের পাশাপাশি সমাজেও রেখেছেন অবদান। অনেকের কাছেই তারা মডেল। সাফল্য অর্জনকারী এসব নারীদের গল্প সবার মুখে মুখে।

পীরগঞ্জ উপজেলার মিঠিপুর ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের দুরামিঠিপুর গ্রামের মোঃ বাবলু মিয়ার স্ত্রী মোছাঃ শাহার বানু। বাবলু মিয়ার সাথে শাজার বানুর ১২ বছর বয়সে বিয়ে হয়। তখন বাবলু বেকার। সংসারে অভাব অনটন লেগেই থাকতো। সংসারের হাল ধরতে শাহার বানু ব্র্যাক সামাজিক ক্ষমতায়ন কর্মসূচীর সহায়তায় পল্লী সমাজ সংগঠনের মধ্যে সম্পৃক্ত হয়ে বিভিন্ন সরকারী ও বেসরকারী অফিসের নাম ও প্রাপ্ত সেবার বিষয় জানতে পারেন। পরে অফিসগুলোতে যোগাযোগ করে কৃষির উপর ও হাঁস , মুরগী গবাদি পশুর উপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি গরুর খামার প্রতিষ্ঠা করে ৬ বিঘা জমি ক্রয় করেছেন।

আরেক সাফল্য অর্জনকারী ফেরদৌসি বেগম। উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের সাতগাড়া গ্রামের মৃতঃ লাল মিয়ার স্ত্রী ফেরদৌসি বেগম। গত ২৮ বছর আগে তাদের বিয়ে হয়। বর্তমানে ১টি ছেলে সন্তান আছে। কষ্টের মধ্যে সন্তানদের লেখাপড়া চলাকালীন বড় ছেলে রমেক হাসপাতালে এমএলএসএস পদে ও ছোট ছেলে পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এমএলএসএস পদে চাকুরী লাভ করে। চাকুরী চলাকালীন বড় ছেলে সাপের কামড়ে মারা যায়। ছোট ছেলে চাকুরীরত রয়েছে। পরে স্বামী ছেলের শোকে অসুস্থ হয়ে মারা যায়। ফেরদৌসি বেগম বর্তমানে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এফউব্লিউএ এর সহযোগি স্বাস্থ্য সেবিকা হিসেবে কর্মরত আছেন।

পীরগঞ্জ উপজেলার ১৩ নং রামনাথপুর ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের রামনাথপুর গ্রামের মোঃ আবু জাফর মিয়ার স্ত্রী মাহমুদা আফরোজ অবসরপ্রাপ্ত সহকারী অধ্যাপক (রসায়ন) শাহ আব্দুর রউফ কলেজ। তিনি ২ সন্তানের জননী। ১ম পুত্র মাহবুবুর রহমান এসএসসিতে জিপিএ ৫, এইচএসসিতে জিপিএ ৫ নিয়ে গ্রাজুয়েশন করে বুয়েট হতে স্থপতি প্রকৌশলী হিসেবে ঢাকায় কর্মরত। ২য় সন্তান জেরিন আফরোজ ঢাকা ডেন্টাল থেকে গ্রাজুয়েশন নিয়েছে। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় রেজিষ্ট্রেশন পরীক্ষায় ১ম পাঠ পাশ করেছে। ২য় পাঠের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। চাকুরীরত অবস্থায় শৈশব থেকে এখন পর্যন্ত মা একাগ্রচিত্তে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে আসছে। মাহমুদা আফরোজ এর পুত্রবধুও মেধাবি। পুত্র সন্তানের স্ত্রী ডা. মাহনাজ ইসলাম মৈত্রি নেফ্রোলজিতে এমডি করছে ও ঢাকা মেডিকেল কলেজে চাকুরীরত।

পীরগঞ্জ উপজেলার ৫নং মদনখালি ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের উল্লাগাড়ি গ্রামের জাহেদুল ইসলামের স্ত্রী মোছাঃ ফাহমিদা খাতুন সোমা নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যেমে জীবন শুরু করেছেন। ২০০৮ সালে বিয়ের পরে সংসারে এসে দেখেন স্বামী বেকার। এরই মধ্যে জন্ম নেয় একটি সন্তান। এসময় স্বামী মদ, জুয়া, গাজা সেবনে ব্যস্ত। বাসায় আসলেই শুরু হতো যৌতুকের জন্য নির্যাতন। নির্যাতন সইতে না পেরে সোমা তার বাবার বাড়ি অঅসে ও ঢাকায় গামেূন্টেসে কাজ করে। পরে স্বামী বিভিন্ন অপরাধে জেল হাজতে চলে যায়। স্বামী ও সন্তানের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে পুনরায় সে স্বামীর বাড়ি চলে আসে। পরে স্বামী জেল থেকে বের হলে তাকে বিভিন্ন কৌশলে সঠিক পথে নিয়ে আসা হয়। বর্তমানে তার স্বামী ইট ভাটায় কাজ করে এবং তিনি উপজেলা মহিলা বিষয়ক অফিস থেকে সেলাই প্রশিক্ষণ নিয়ে বাড়িতে সেলাই কাজ করেন। পাশাপাশি এসডিএফ অফিসে স্থানীয়ভাবে কাজ করে অর্থ উপার্জন করে স্বামী সন্তান নিয়ে সুখে আছেন।

সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছেন পীরগঞ্জ পৌরসভার ৬নং ওসমানপুর গ্রামের মরহুম বীরমুক্তিযোদ্ধা আমজাদ হোসেনের প্রথম সন্তান আব্দুল আজিজের স্ত্রী মোছাঃ আঞ্জুমান আরা স্মৃতি। তিনি ১২নং মিঠিপুর জাগরণ দারিদ্র বিমোচন মহিলা সমিতির সভানেত্রী। ২৫ বছর আগে বিয়ের পরে স্মৃতি এসএসসি লেখাপড়া শেষে শতরঞ্জি, হাত এম্ব্রয়দারী, দর্জি কাটিং, মেশিন এমব্রয়দারী, হস্ত কুটির শিল্পসহ ৫টি বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। তার ১ ছেলে ও ১ মেয়ে রয়েছে। বর্তমানে আঞ্জুমান আরা স্মৃতির রংধনু বুটিক্স/কারুপণ্যের একটি বিপনন কেন্দ্র আছে যা জামান প্লাজায় পৌরসভার নীচতলায় অবস্থিত। সংস্থায় প্রায় ৩৫ জন নারী, শতরঞ্জি, নকশীকাথা, হাতের তৈরি থ্রিপিচ, বেডশীট, টিসু বক্স, ব্যাগসহ কাজের মাধ্যমে নারীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন।

উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা মোছাঃ নুরেশ কাওসার জাহান জানান, নারীদের সাফল্য এখন বলে শেষ করা যাবে না। তারা এখন পিছিয়ে নেই। যারা নিজেদের স্বাবলম্বি করতে চান সকলকেই আমরা সরকারীভাবে সহযোগিতা করি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিরোদা রাণী রায় বলেন, আমরা নারীর ক্ষমতা উন্নয়নে সরকারে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছি। সমাজের উন্নয়নে শুধু পুরুষরা এগিয়ে থাকলে হবে না, নারীদেরও সমান তালে এগুতে হবে।

রংপুর জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপ পরিচালক কাওছার পারভীন জানান, শুধু পীরগঞ্জ নয় গোটা জেলায় এখন সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচীতে নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে। নির্যাতিতরা হটলাইনে সেবা নিচ্ছে। আবার যারা স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখেন তারা প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেদের জীবন মান পাল্টে ফেলেছেন। বর্তমান সরকার নারীদের এগিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর।

Show More

News Desk

তিস্তা নিউজের নিউজ রুম থেকে সমস্ত বিভাগসহ বাংলাদেশের সর্বশেষ সংবাদ প্রকাশ করা হয়। আপনি যদি তিস্তানিউজ ২৪.কম এ প্রকাশের জন্য আমাদের ট্রেন্ডিং নিউজ প্রেরণ করতে চান তবে আসুন এখনই আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন। আপনার নিউজটি আমাদের নিউজ রুম থেকে নিউজ ডেস্ক হিসাবে প্রকাশিত হবে। আমাদের সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদান্তে- আব্দুল লতিফ খান, সম্পাদক মন্ডলির সভাপতি।

Related Articles

Back to top button
Close

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker