তিস্তা নিউজ ডেস্ক ঃ আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবস উপলক্ষে ‘সেভ দ্য ইয়ূথ, সেভ দ্য নেশন’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে রাজধানীতে ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘রান এগেনেইস্ট ড্রাগ’ কর্মসূচি পালন করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির।
সপ্তাহব্যাপী মাদকবিরোধী ক্যাম্পেইন ‘ইয়ূথ এগেনেইস্ট ড্রাগ’-এর অংশ হিসেবে শুক্রবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এই কর্মসূচি পালিত হয়।
সকাল সাড়ে ৭টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে উদ্বোধনী সমাবেশের মধ্য দিয়ে এই রানিং ইভেন্ট শুরু হয়। উদ্বোধনী সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম। এতে বক্তব্য রাখেন ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য কামাল হোসেন, ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মোহাম্মদ ইয়াসিন আরাফাত ও জাহিদুল ইসলাম, ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ, কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক আজিজুর রহমান আজাদ এবং কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ও ডাকসু জিএস এসএম ফরহাদসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রানিং রুটটি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে শুরু হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, শাহবাগ, কাঁটাবন, নীলক্ষেত, ভিসি চত্বর এবং ফুলার রোড প্রদক্ষিণ করে পুনরায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এসে শেষ হয়। যুবসমাজকে মাদকের ভয়াল থাবা থেকে রক্ষায় সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে ছাত্রশিবিরের জনশক্তির পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক তরুণ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন।
সভাপতির বক্তব্যে কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম বলেন, মাদক একটি সামাজিক ব্যাধি। এই ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। সরকার মাদক নিয়ন্ত্রণে অধিদপ্তর গঠন করেছে, পুনর্বাসন কেন্দ্রও তৈরি করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে মাদকের ভয়াবহতা কমার বদলে দিন দিন বাড়ছে। দেশে বর্তমানে ৮৩ লক্ষ মাদকসেবী রয়েছে এবং মোট ফৌজদারি অপরাধের ৩৮ শতাংশই সংঘটিত হয় মাদককে কেন্দ্র করে। প্রতিবছর মাদকের কারণে ৪৪১ মিলিয়ন ডলার অবৈধভাবে দেশ থেকে পাচার হয়ে যাচ্ছে এবং প্রায় ৫ লক্ষ মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে।
তিনি আরও বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে প্রতিনিয়ত শত শত মানুষ আহত হচ্ছে, হত্যার শিকার হচ্ছে। লক্ষ লক্ষ যুবক তার যৌবন হারাচ্ছে। শুধু মাদক গ্রহণ করার কারণে পারিবারিক কলহ, পারিবারিক বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটছে। মাদক গ্রহণ করাকে কেন্দ্র করে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে পরিবারের সদস্যদেরকে হত্যা করছে। মাদক গ্রহণের টাকা না দিতে পারার কারণে পিতা তার সন্তানকে হত্যা করছে, সন্তান তার পিতার গায়ে হাত তুলছে, মায়ের গায়ে হাত তুলছে।
সম্মিলিত প্রচেষ্টার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, মাদকের মতো ভয়াবহ ব্যাধি দূর করতে হলে সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার। এ ক্ষেত্রে সরকারের সদিচ্ছা ও উদ্যোগ সবার আগে প্রয়োজন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, মাদকের এই সিন্ডিকেটের সাথে বর্তমান সরকারের মানুষজনই জড়িত হয়ে পড়েছে, তাদের ছত্রছায়ায় এই মাদকের বিস্তার ঘটছে।" তিনি জোর দিয়ে বলেন, "ইসলামী ছাত্রশিবিরের কাছে যুবসমাজকে শতভাগ মাদক থেকে দূরে রাখার 'এক্সপেরিমেন্টাল ট্রুথ ফর্মুলা' রয়েছে, যা দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োগ করলে তরুণ সমাজকে শতভাগ মাদক থেকে বিরত রাখা সম্ভব। আমরা সকল ছাত্র সংগঠনের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাই—আপনারা দলীয় প্রমোশনের সস্তা হাতিয়ার হিসেবে মাদককে প্রশ্রয় না দিয়ে এর বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করুন।
অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্যে সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মুহাম্মদ ইয়াসিন আরাফাত বলেন,সমাজের বর্তমান অধিকাংশ সমস্যার মূল উৎপত্তি এই মাদক। রাষ্ট্র একদিকে মাদকের বিরুদ্ধে প্রচার চালায়, অন্যদিকে তা নির্মূলে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে চরমভাবে ব্যর্থ। আমাদের কারাগারগুলো আজ মাদকের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্রকে অবশ্যই মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করতে হবে। রাষ্ট্র ব্যর্থ হলে আগামী দিনে ইসলামী ছাত্রশিবিরকে ‘ফাইট এগেইনস্ট ড্রাগ’ বা মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে।
সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম বলেন, ইসলামের দৃষ্টিতে মাদক ও সব ধরনের নেশাজাতীয় দ্রব্য থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকার নির্দেশনা রয়েছে। তিনি ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার মাধ্যমে মাদকের বিস্তার রোধ করা সম্ভব বলে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, ছাত্রশিবিরের বর্তমান ও সাবেক সকল জনশক্তি মাদকমুক্ত এবং যুবসমাজকে মাদকবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত করতে ‘Run Against Drugs’-এর মতো সচেতনতামূলক কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য কামাল হোসেন দেশের তরুণ সমাজকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে সরকারকে আরও কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান। তিনি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের জনবল ও লজিস্টিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, মাদক সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে দেশপ্রেমিক জনগণ, শিক্ষার্থী ও যুবসমাজকে সম্পৃক্ত করে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে তিনি বাজেটে তামাকজাত পণ্যের কর কাঠামোর সমালোচনা করে বলেন, মাদক নির্মূলে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পর্যাপ্ত বাজেট, জনবল এবং দৃশ্যমান কার্যকর পদক্ষেপ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে সর্বস্তরের জনগণকে সম্পৃক্ত করারও আহ্বান জানান তিনি।
ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ দেশের ক্রমবর্ধমান মাদক সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, মাদক পাচারের পথ বন্ধ, তরুণ সমাজকে মাদকমুক্ত রাখা এবং শারীরিকভাবে সুস্থ ও সক্ষম প্রজন্ম গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে তিনি এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে ছাত্রশিবিরের মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক কার্যক্রম ও যুবসমাজের শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিমূলক উদ্যোগ অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
আয়োজনে কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদের সদস্যবৃন্দ, ঢাকাস্থ বিভিন্ন শাখার নেতৃবৃন্দ এবং বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষ উপস্থিত ছিলেন।


