তিস্তা নিউজ ডেস্ক ঃ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সংসদের উচ্চকক্ষেও (প্রস্তাবিত) একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকছে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন প্রস্তাবিত ও জুলাই সনদে উল্লিখিত ভোটের হিসাব এবং বিএনপি প্রস্তাবিত সংসদের নিম্নকক্ষ আসনের হিসাব—দুটিতেই সংসদের উচ্চকক্ষে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে বিএনপির। আর সেটা হলে উচ্চকক্ষের মাধ্যমে সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি এবং ক্ষমতার ভারসাম্য (চেক অ্যান্ড ব্যালান্স) নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। সে ক্ষেত্রে ওই আকাঙ্ক্ষা পূরণে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
নির্বাচনী ফল অনুযায়ী, ২৯৭টি আসনে বিএনপির প্রাপ্ত ভোটের হার ৪৯.৯৭ শতাংশ। অর্থাৎ এসব আসনে বিএনপি যে ভোট পেয়েছে, তাতে ভোটের হার বিবেচনায় উচ্চকক্ষ গঠিত হলে তাতে বিএনপির অর্ধেক আসন নিশ্চিত হয়েছে। এরপর চট্টগ্রাম-২ ও চট্টগ্রাম-৪ আসনের ফল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত না হলেও ওই দুই আসনে বিএনপির প্রার্থীরা সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছেন। এ ছাড়া একটি আসনে ভোটগ্রহণ স্থগিত রয়েছে।
ওই তিনটি আসনের ভোট যুক্ত হলে বিএনপির ভোট ৫১ শতাংশে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। আর সেটা হলে উচ্চকক্ষে দলটির আসন হবে ৫১টি। অর্থাৎ বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। এরপর বিএনপির শরিক দলগুলোর ভোট রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রাপ্ত ভোটের হার ৩১.৭৬ শতাংশ। দলটি উচ্চকক্ষে ৩২টি আসন পাবে। নির্বাচনে যেসব দল এক শতাংশের কম ভোট পেয়েছে, তাদের কোনো প্রতিনিধি উচ্চকক্ষে থাকবে না। সে ক্ষেত্রে ভোটের হিসাবে উচ্চকক্ষ গঠন করা হলে সেখানে পাঁচটি দল জায়গা পাবে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৩.০৫ শতাংশ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ২.৭০ শতাংশ ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২.০৯ শতাংশ ভোট পেয়েছে।
অন্য ছোট দলগুলোর ভোটের হার ১ শতাংশের নিচে। এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নির্বাচনে মোট ৫.৭৯ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। এসব প্রার্থী জোটবদ্ধ হলে ভোটের হিসাবে ছয়টি আসন পেতে পারেন উচ্চকক্ষে।
জুলাই সনদে প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষ গঠনের কথা থাকলেও সেখানে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (আপত্তি বা দ্বিমত) রয়েছে বিএনপির। দলটির নির্বাচনী ইশতেহারে আসনভিত্তিক উচ্চকক্ষ গঠনের কথা বলা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে সংরক্ষিত নারী আসনের হিসাবে (তিনজনের বিপরীতে একজন), একইভাবে উচ্চকক্ষ গঠিত হলে বিএনপি ৬৩টি, জামায়াত ২৩টি ও এনসিপি দুটি আসন পাবে। ২৯৭ আসনের মধ্যে বিএনপির ২০৯টি, জামায়াত ৬৮টি ও এনসিপি ছয়টি পেয়েছে। এ ছাড়া সাতটি আসনে বিজয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জোট গঠন করলে উচ্চকক্ষে তাঁরা দুটি আসন পাবেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা জানান, সংসদের উচ্চকক্ষ গঠনের মূল উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহি ও ভারসাম্য নিশ্চিত করা। কিন্তু নির্বাচনী ফলাফল অনুযায়ী এটা স্পষ্ট, ভোটের অনুপাত বা আসনের অনুপাত, উভয় ক্ষেত্রেই উচ্চকক্ষে বিএনপির একক আধিপত্য বজায় থাকবে। দলটি ৫১ শতাংশের বেশি ভোট বা আসন পাচ্ছে। এতে উচ্চকক্ষের কার্যকারিতা হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। নিম্নকক্ষের (জাতীয় সংসদ) মতো উচ্চকক্ষে একই দলের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে আইন প্রণয়ন বা নীতিনির্ধারণে কাঙ্ক্ষিত ভারসাম্য তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। বরং তা আমাদের মতো দেশের জন্য একটি বোঝা হয়ে দেখা দিতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক জানান, নিরঙ্কুশ নিম্নকক্ষে চেক অ্যান্ড ব্যালান্স নেই, উচ্চকক্ষেও থাকার সুযোগ কম। কারণ দলীয় আনুগত্যের বাইরে গিয়ে সংসদ সদস্যদের ভোট দেওয়ার সংস্কৃতি বাংলাদেশে এখনো তৈরি হয়নি। ফলে সরকার যদি কোনো আইন পাস করতে চায় এবং নিম্নকক্ষে তাদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকে, তবে উচ্চকক্ষেও তাদের লোকবল বেশি থাকায় সেটি সহজেই পাস হয়ে যাবে। তাই পদ্ধতি যাই হোক, ৫১ শতাংশের বেশি জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসা দলের ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষ কার্যত ‘সিলমোহর’ দেওয়ার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে বিরোধী দলগুলোর ‘শ্যাডো ক্যাবিনেট’ বা ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, সরকারদলীয় কাজকে মনিটরিং করার জন্য প্রায় দেশেই এমন ছায়া মন্ত্রিসভা আছে। বাংলাদেশেও এটা আরো আগে বাস্তবায়ন হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু হয়নি। ছায়া মন্ত্রিসভা হলে সরকারদলীয় মন্ত্রীরা সচেতন থাকার চেষ্টা করেন ভুলভ্রান্তি থেকে। এটা দরকার। যদি বিরোধী দলগুলো এটি কার্যকর ও সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করতে পারে এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে পারে, তবে তা সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিতে উচ্চকক্ষের চেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও জামায়াত নেতা শিশির মনির সম্প্রতি নিজেদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। এর পর ছায়া মন্ত্রিসভা নিয়ে কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে। আসিফ মাহমুদ জানিয়েছেন, সরকারের কার্যক্রমের ওপর নজরদারি বা ‘ওয়াচডগ’ হিসেবে কাজ করাই হবে ছায়া মন্ত্রিসভার মূল লক্ষ্য। এটি কোনো সমান্তরাল সরকার নয়, বরং সরকারের ভুল-ত্রুটি ধরা এবং বিকল্প নীতি প্রস্তাব করার মাধ্যম। শিশির মনির জানিয়েছেন, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তাঁরা এই পদক্ষেপ নিচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞরা জানান, ছায়া মন্ত্রিসভা হলো সংসদীয় গণতন্ত্রের একটি বিশেষ কাঠামো। বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে ছায়া মন্ত্রিসভার গুরুত্ব অপরিসীম। এটি মূলত ওয়েস্টমিনস্টার পদ্ধতিতে জনপ্রিয়। এতে প্রধান বিরোধী দল বা অন্য রাজনৈতিক দলগুলো সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে একজন করে ‘ছায়ামন্ত্রী’ নিয়োগ দেয়। তাঁদের প্রধান কাজ হলো—সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্তের চুলচেরা বিশ্লেষণের মাধ্যমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। সরকারের বাজেটের বিপরীতে জনবান্ধব বিকল্প বাজেট তুলে ধরা। প্রশাসনিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি বা অসংগতি জনগণের সামনে আনা। আর এর মাধ্যমে বিরোধী দলের নেতাদের প্রশাসনিকভাবে দক্ষ করে তোলা। দেশে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনে কোনো সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে এর সরাসরি কোনো প্রশাসনিক ক্ষমতাও নেই, তবে এটি নৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস। সে ক্ষেত্রে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠিত হলে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হবে।


